latest Post

অবরোধে অচল অর্থনীতির চাকা, উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ীরা

রাজনৈতিক অচলাবস্থায় যাঁতাকলে পিষ্ট দেশের অর্থনীতি। বিনিয়োগ, আমদানি-রফতানি, নিত্যপণ্য, পোশাক খাত, ক্ষুদ্র-মাঝারী ব্যবসাসহ পুরো অর্থনীতি জিম্মি হয়ে পড়েছে। গত কয়েক দিনের টানা অবরোধে অচল হয়ে পড়েছে জাতীয় অর্থনীতির চাকা। এতে করে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের স্বার্থের বলি হয়ে ক্রমশই অনিশ্চয়তায় ডুবছে অর্থনীতি।
বিপর্যয়ের মুখে পোশাক খাত : টানা অবরোধে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে তৈরি পোশাকশিল্প। এ শিল্প এখন বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে। একই সঙ্গে কঠিন ইমেজ সংকট এবং অস্তিত্ব সংকটে পড়তে চলেছে এ শিল্পটি।

বিজিএমইএ সূত্র মতে, গত ২০১৩ এর ১ নভেম্বর থেকে ২০১৪ এর ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত হরতাল ছিলো ১৩ দিন, অবরোধ ৩১ দিন আর পরিবহণ নিষেধাজ্ঞা ছিলো আরো তিন দিন। এই ৪৭ দিনে উৎপাদন ব্যাহত হবার পাশাপাশি স্থবির হয়ে পড়ে পণ্য পরিবহন। এতে দিনে অন্তত আড়াইশ’ কোটি টাকা হিসাবে ১২ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

সূত্র  জানায়, গত বছরে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে পোশাক খাতে ৫ হাজার ৫শ’ কোটি টাকার এয়ার শিপমেন্ট করতে হয়েছে। আর ৯ হাজার কোটি টাকার পণ্য ডিসকাউন্ট হয়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৬.৮৯ বিলিয়ন ডলার, যা টাকার অংকে প্রায় ২ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। সেই হিসাবে ১ দিন অররোধ-হরতাল থাকলে ৬৯৫ কোটি টাকার পোশাক রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয়। আর প্রতিদিন এই শিল্পে প্রকৃত উৎপাদনের মূল্যমান হচ্ছে প্রায় ৪৩০ কোটি টাকা। যদি উৎপাদন হরতাল-অবরোধের কারণে ৫০ শতাংশও বিঘ্নিত হয়, তাহলে প্রতিদিন উৎপাদন ব্যাহত হয় অন্তত ২১৫ কোটি টাকা।

বিজিএমইএ সভাপতি মো. আতিকুল ইসলাম জাস্ট নিউজ’কে জানান, টানা অবরোধে পোশাক শিল্প বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে। একদিনের অবরোধে ৬৯৫ কোটি টাকার পোশাক রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তিনি বলেন, আমরা যখন পোশাক শিল্পের আগামী দিনগুলোকে ঘিরে একটি স্বপ্ন রচনা করতে শুরু করেছিলাম, তখন রাজনৈতিক সহিংসতা একটি দানব আকারে আমাদের সামনে আবির্ভূত হয়েছে। রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে রাজনীতিকরা আমাদের ব্যবসা, বিনিয়োগকে জিম্মি করে রেখেছেন।

মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, আমরা স্বাভাবিকভাবে মালামাল আনা-নেয়া করতে পারছি না? ক্রেতারা এটিকে মোটেও সুনজরে দেখছেন না। তাছাড়া, শুধুমাত্র ঢাকা ও চট্টগ্রামই নয়- পোশাক শিল্পের বিভিন্ন এঙেসরিজ যেমন বোতাম, জিপার, সুতাসহ বিভিন্ন সামগ্রী স্থানীয় পর্যায়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করতে হয়। অবরোধ-হরতাল থাকলে এগুলো সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না। ফলে সমগ্র সাপ্লাই চেইন ব্যাহত হচ্ছে।

অচল স্থলবন্দরগুলো : অনির্দিষ্টকালের টানা অবরোধে স্থবির হয়ে পড়েছে স্থলবন্দরগুলোর কার্যক্রম। বাংলাবান্ধা, হিলি ও বেনাপোল স্থলবন্দরের দুইপাশেই আটকে পড়েছে শতশত পণ্য বোঝাই ট্রাক। এতে পরিবহণ মালিকদের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ব্যবসায়ীরাও। যার প্রভাবে রাজধানীসহ সারাদেশে পণ্য সংকট সৃষ্টি হচ্ছে, ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন ব্যবস্থা।

অচল হয়ে পড়েছে পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের কার্যক্রম। বন্দরের উভয় পাশে আটকা পড়েছে প্রায় শতাধিক পণ্যবাহী ট্রাক।

আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দরেও। দুই দেশের পণ্যবাহী প্রায় পাঁচশ’ ট্রাক আটকা পড়ে আছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, হিলি স্থলবন্দরের মাধ্যমে ভারত থেকে কয়লা আমদানি করা হয়। অবরোধের কারণে আটকা পড়েছে আমদানিকৃত কয়েকশ’ ট্রাক কয়লা। এর ফলে জ্বালানি সংকটে পড়েছেন ইটভাটা মালিকরা। এছাড়া অবরোধের কারণে চাল, গম, ভুট্টা ও পেঁয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বাজারে সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।

স্থবিরতা বেনাপোল স্থলবন্দরেও। গত এক সপ্তাহে পণ্য বোঝাই সাতশ’ ট্রাক প্রবেশ করলেও বন্দরে তা আটকে আছে। অবরোধ প্রত্যাহার না হলে পণ্য সরবরাহ শুরু করা করা যাবে না।

টানা অবরোধে চট্টগ্রাম বন্দরের অভ্যন্তরে স্বাভাবিক কার্যক্রম চললেও বন্দর থেকে ঢাকামুখী কনটেইনারের জট সৃষ্টি হয়েছে। গত কয়েক দিনে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকামুখী অন্তত সাত শতাধিক কনটেইনার বন্দর ইয়ার্ডে আটকা পড়েছে।

পরিবহন, কৃষি ও শিল্প : গত ৭ দিনের অবরোধে পরিবহন, কৃষি ও শিল্প খাত বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে আসা অতিথিরা হোটেলের বুকিং বাতিল করছে বলে জানিয়েছে হোটেল কর্তৃপক্ষ।

ব্যবসায়ীরা জানান, স্বাভাবিক সময়ে দিনে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে পাঁচ হাজারেরও বেশি পণ্যবাহী গাড়ি চলাচল করলেও হরতাল অবরোধে তা নেমে আসে দেড় হাজারের নিচে।

ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রুস্তম আলী খান, পরিবহন খাতে দৈনিক প্রায় দুইশ’ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে বলে জানিয়েছে। উৎপাদিত পণ্য পাইকারের কাছে বিক্রি করতে না পারায় ক্ষেতেই পচে যাচ্ছে কৃষকের পণ্য।

বগুড়া প্রতিনিধি জানান, অবরোধের কারণে পরিবহন বন্ধ থাকায় খামারিদের কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ বন্ধ করে দিয়েছেন মিল্কভিটাসহ বড় কোম্পানিগুলো। এতে উৎপাদিত দুধের ন্যায্য দাম পাচ্ছে না কৃষকরা। ৬০ টাকার লিটারের দুধ ২০ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

নিত্যপণ্যের বাজার চড়া : টানা অবরোধে ঊর্ধ্বমুখী রাজধানীর নিত্যপণ্যের বাজার। পণ্যবাহী ট্রাক ঢাকায় প্রবেশ করতে পারায় চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাছ, মাংসসহ সবধরণের পণ্যের দাম বাড়তি। বাবুবাজার, বাদামতলী ও কাওরান বাজার আড়তে প্রতি বস্তা চালের দাম বেড়েছে ৫০ থেকে ১০০ টাকা। এছাড়া ভরা মওসুমেও আলু ও ক্ষীরার দাম বেড়েছে।

বাদামতলী ও বাবুবাজার চাউল আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজী মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন জানান, এখানে প্রতিদিন প্রায় একশ’ ট্রাক চাল আসে। ৭ দিনের অবরোধে এ পর্যন্ত হাতেগোনা কয়েক ট্রাক চাল এসেছে। বাড়তি টাকা দিলেও ট্রাক চালকরা আসতে চাইছে না।

অবরোধে রাজধানী কাওরান বাজারের সবজি ব্যবসায়ীরাও পড়েছেন চরম বিপাকে। পিকেটারদের ছোড়া ঢিল, আগুন, বোমাতঙ্ক আর চালকদের অতিরিক্ত ট্রাক ভাড়ার কারণে ক্ষেতের সবজি ক্ষেতেই নষ্ট হচ্ছে।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ-টিসিবির তথ্য মতে, বাজারে বেড়েছে আমদানি করা ডাল, রসুনসহ বেশ কিছু নিত্যপণ্যের দাম। পণ্য পরিবহণ ব্যহত হওয়ার কারণেই দাম বেড়েছে, বলছেন ব্যবসায়ীরা।

যাত্রাবাড়ী বুড়িগঙ্গা মৎস্য বাজারের ম্যানেজার আবদুল মান্নান বলেন, অবরোধে দৈনিক বিক্রি ৭ কোটি থেকে ৪ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।

কুষ্টিয়ার দাদা মিনিকেট চালের স্বত্বাধিকারী শফিকুল ইসলাম জানান, অবরোধ শুরু থেকে আজ পর্যন্ত একটি গাড়িও ঢাকায় পাঠাতে পারিনি। গতকাল দু’টি গাড়ি প্রথমে লোড করি, পরে অবরোধ আরও কঠিন হতে পারে শোনার পর শেষ পর্যন্ত সাহস পাইনি।

কমেছে রপ্তানি আয় : চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬ মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় সাড়ে ৪% রপ্তানি কম হয়েছে। তবে আগের অর্থবছরের চেয়ে রপ্তানি হয়েছে প্রায় দেড় শতাংশ বেশি। বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো-ইপিবি এ তথ্য জানিয়েছে।

ইপিবির সবশেষ তথ্য থেকে দেখা গেছে, প্রথম ছয় মাসে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ৫৬০ কোটি ডলার। এর বিপরীতে অর্জিত হয়েছে এক হাজার ৪৯১ কোটি ডলার। গেল ছয় মাসে উভেন পোশাক রপ্তানিতেও নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আগের বছরের প্রথম ছয় মাসের চেয়ে এ বছর প্রায় ২ কোটি ডলার কম রফতানি হয়েছে। আগের বছরের চেয়ে কমেছে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানিও। তবে নিটওয়্যারে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলেও আগের বছরের চেয়ে প্রায় ২% বেশি রপ্তানি হয়েছে। মোট ৭৬টি রপ্তানি মিশনের মধ্যে লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছে মাত্র ৩৭টি মিশন।

অবরোধে বিপাকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা : অনির্দিষ্টকালের অবরোধে বিপাকে পড়েছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও খেটে খাওয়া মানুষেরা। রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পর বিরোধী অবস্থানের কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে উৎপাদন ও পণ্যের পরিবহন। জীবিকার তাগিদে পথে নেমেও অবরোধের কারণে প্রায় খালি হাতেই ঘরে ফিরতে হচ্ছে তাদের। রাজনৈতিক টানাপড়েনের জেরে পুঁজি হারানোর আশঙ্কাও করছেন কেউ কেউ।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমাদের দোকানের আয় থেকে সংসার চলে। আমাদের বেচাকেনা না হলে না খেয়ে থাকতে হবে। এই অবস্থা চলতে থাকলে ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে।

অর্থনীতির অচলাবস্থা কাটাতে রাজনৈতিক দলগুলোর জরুরি সংলাপে বসার আহবান জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই’র সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন বলেন, টানা অবরোধে মুখ থুবড়ে পড়বে দেশের অর্থনীতি। সংকট মোকাবেলায় রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতার বিকল্প নেই।
সূত্র:ইন্টারনেট

About aloeindica

aloeindica
Recommended Posts × +

0 comments:

Post a Comment